প্রেম নিয়ে বিজ্ঞানীদের ধারণা
প্রেয নিয়ে
বিজ্ঞানীরা যে ধারণা পোষণ করেন, তা মূলত স্নায়ুবিজ্ঞান (Neuroscience) এবং বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের (Evolutionary Biology) দৃষ্টিকোণ থেকে। তাঁদের মতে, প্রেম একটি রহস্যময় আবেগ হলেও, এর একটি শক্তিশালী জৈব ও রাসায়নিক ভিত্তি রয়েছে।
এখানে বিজ্ঞানীরা প্রেমের বিষয়ে যে প্রধান ধারণাগুলি দেন, তা তুলে ধরা হলো:
১. প্রেমের তিনটি প্রধান পর্যায় (Three Phases of Love)
নৃবিজ্ঞানী হেলেন ফিশার (Helen Fisher) এর মতো গবেষকরা প্রেমকে তিনটি স্বতন্ত্র কিন্তু পরস্পর সংযুক্ত পর্যায়ে ভাগ করেছেন:
* কামনা (Lust): এটি প্রধানত টেস্টোস্টেরন (Testosterone) এবং ইস্ট্রোজেন (Estrogen) হরমোন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, যার লক্ষ্য হলো যৌন তৃপ্তি ও প্রজনন।
* আকর্ষণ (Attraction): এটি হলো প্রেমের সেই রোমাঞ্চকর প্রাথমিক পর্যায়, যখন আপনি একজনের প্রতি তীব্র আকর্ষণ অনুভব করেন। এই সময় মস্তিষ্কে যে রাসায়নিকগুলি নিঃসৃত হয়, তা হলো:
* ডোপামিন (Dopamine): এটি 'পুরস্কার' (Reward) এবং আনন্দের অনুভূতি সৃষ্টি করে। এই সময়ে হওয়া উত্তেজনা কোকেন বা অন্যান্য আসক্তি সৃষ্টিকারী পদার্থের আসক্তির সাথে তুলনীয়।
* নোরপাইনফ্রাইন (Norepinephrine) / অ্যাড্রেনালিন (Adrenaline): এর কারণে হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, হাত ঘেমে যায় এবং এক ধরণের উত্তেজনা কাজ করে।
* সেরোটোনিন (Serotonin) হ্রাস: প্রথম দিকে সেরোটোনিন কমে যায়, যা কিছুটা শুচিবায়ু (Obsessive-Compulsive) প্রকৃতির চিন্তাভাবনা বা ভালোবাসার মানুষের প্রতি তীব্র আবেশ তৈরি করতে পারে।
* আসক্তি বা বন্ধন (Attachment): এটি হলো দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর সম্পর্কের ভিত্তি। এই সময় ডোপামিন এবং নোরপাইনফ্রাইন-এর প্রভাব কমতে থাকে এবং এই হরমোনগুলি প্রধান ভূমিকা নেয়:
* অক্সিটোসিন (Oxytocin): 'আলিঙ্গন হরমোন' বা 'লাভ হরমোন' নামে পরিচিত। স্পর্শ, চুম্বন এবং ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে এটি নিঃসৃত হয় এবং বন্ধন, আস্থা ও নিরাপত্তার অনুভূতি বাড়ায়।
* ভ্যাসোপ্রেসিন (Vasopressin): এটি দীর্ঘস্থায়ী ও একগামী সম্পর্ক বজায় রাখতে সাহায্য করে।
২. মস্তিষ্ক এবং পুরস্কার ব্যবস্থা (Brain and Reward System)
প্রেম মূলত মস্তিষ্ক থেকে উৎপন্ন হয়, হৃদয় থেকে নয়। তীব্র আকর্ষণ বা প্রেমে পড়ার সময় মস্তিষ্কের মেসোলিম্বিক সিস্টেম (Mesolimbic System) বা রিওয়ার্ড সার্কিট (Reward Circuit) - যা ডোপামিন সমৃদ্ধ - বিশেষভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই সার্কিটটি আমাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় কাজ (যেমন - খাওয়া) করার জন্য যেভাবে উদ্দীপনা যোগায়, ঠিক সেভাবেই ভালোবাসার মানুষকে পাওয়ার জন্য বা তার কাছাকাছি থাকার জন্য আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে।
৩. বিবর্তনীয় উদ্দেশ্য (Evolutionary Purpose)
বিবর্তনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে, বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে প্রেম একটি অনুপ্রেরণামূলক চালিকাশক্তি (Motivational Drive) যা মানুষের বেঁচে থাকা ও প্রজাতি টিকিয়ে রাখার জন্য জরুরি। কামনা প্রজনন নিশ্চিত করে, আকর্ষণ সঠিক সঙ্গী খুঁজে নিতে সাহায্য করে এবং আসক্তি বা বন্ধন সন্তানের লালন-পালন ও সুরক্ষার জন্য বাবা-মাকে একসঙ্গে থাকতে উৎসাহিত করে।
সংক্ষেপে, বিজ্ঞানীদের কাছে প্রেম হলো জৈব রাসায়নিক, স্নায়ুসংক্রান্ত কার্যকলাপ এবং বিবর্তনীয় প্রয়োজনের এক জটিল মিশ্রণ যা মানুষের আচরণ, আবেগ ও সামাজিক বন্ধনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

0 Comments